বই রিভিউ

সেরা বই রিভিউ : মোগল শাষণ নিয়ে বইটির রিভিউ দেখে নিন !

সেরা বই রিভিউ পড়ুন আমাদের সাইটে !  : মোগল বংশের ভারতবর্ষে উত্থানের শুরু থেকে পতন পর্যন্ত তিনশ বত্রিশ বছরের পুরো মোগল শাসনামলের ইতিহাস পড়ে ইতি টানলাম। বিষাদে চেয়ে গেছে মন। যে মোগল বলতেই আমাদের চোখের সামনে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি, জৌলুস চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার আবার এমন করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে তাদের অবসান দেখতে গিয়ে সত্যিই বিষাদে চেয়ে গেছে মন।
মোগল ইতিহাস নিয়ে মাহমুদুর রহমানের মোগলনামা প্রথম খন্ড এবং মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ড একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র। ১৯শে প্রকাশিত আমার পড়া বইগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি সুখপাঠ্য বই ছিল মাহমুদুর রহমানের “মোগলনামা প্রথম খন্ড।” প্রথম খন্ডে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবুর থেকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামল পর্যন্ত, ছয়জন সম্রাটের শাসনামল উপস্থাপন করা হয়েছে। এবং দ্বিতীয় খন্ডে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের ইতিহাস পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে লেখক উপস্থাপন করেছেন।
সেরা বই রিভিউ পড়ুন আমাদের সাইটে !
আজ পড়ে শেষ করলাম মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ড। কিন্তু ইতিহাসের বইয়ের রিভিউ লেখার সাহস অথবা যোগ্যতা আমার মতো ক্ষুদ্র পাঠকের এখনো হয়নি। আমি কেবল আমার নিজের মতো ভালো লাগা মন্দ লাগা বলতে চেষ্টা করবো।
মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ড শুরু করার পর প্রথম ৬০/৭০ পৃষ্ঠা বেশ দ্রুত এগিয়েছে। এর কারণ হতে পারে প্রথম খন্ড পড়ার রেশ অনুযায়ী চরিত্র, মোগল প্রশাসন, সাম্রাজ্য ইত্যাদির সাথে মোটামুটি পরিচিত থাকায়। কিন্তু বইয়ের মাঝের অংশটা অনেকটা ধীরে এগিয়েছে। কারণ, এই মাঝের ইতিহাসটা সম্পর্কে আমাদের ধারণা কম। মূলতঃ ইতিহাসের এই অংশটা অনেকটা আমাদের মাঝে অনুপস্থিত। এর একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়ার জন্য এই লেখাটার খুব প্রয়োজন ছিল। শেষ অংশটা খুব দ্রুত এগিয়েছে। শেষের অংশটার সম্পৃক্ত ইতিহাসের সাথে আমরা অনেক পরিচিত। পলাশীর পরাজয়ের থেকে সিপাহী বিদ্রোহ পর্যন্ত সময়টা আমাদের পাঠ্যবইয়ে অনেক পড়ার সুবাদে অনেকটাই পরিচিত জগতের মতো ছিল। তাই খুব দ্রুত এগিয়েছে এই টালমাটাল সময়টা।
সেরা বই রিভিউ পড়ুন আমাদের সাইটে !
আমরা ভারতবর্ষের মোগল ইতিহাস মাত্রই বাবুর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত পরিষ্কার বুঝি। তারপর থেকেই মোগলদের প্রভাব প্রতিপত্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কিন্তু এরপরেও মোগল সিংহাসন টিকে ছিল দেড়শো বছর। এই দেড়শো বছরে মহান সম্রাট আকবর কিংবা আওরঙ্গজেবের মতন কোনো প্রতাপবশালী সম্রাটের আগমন ঘটেনি। তাই আমরা দেখি ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু এই পঞ্চাশ বছরের ভেতরে মোগল সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাংলাই বা কবে কিভাবে স্বাধীন হলো? আর এরপরেও মোগল সিংহাসন কিভাবে আরো একশত বছর টিকে ছিল? তারই পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে মোগলনামা দ্বিতীয় খন্ডে।
১৭০৭ সালে মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রতাপশালী সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ১৭১৯ সাল পর্যন্ত ১২ বছর সময়ে ছয় জন সম্রাট মোগল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। কেউ তিন থেকে চার মাসের জন্যও সিংহাসনে বসেন। এ সময় সিংহাসন নিয়ে ভাতৃ বিরোধ, সৈয়দ ভাইদের মতো মোগল আমাত্যদের লোভ লালসা অনেক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় ১৭১৯ সালে মুহাম্মদ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর প্রথম কোন সম্রাট দীর্ঘদিন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থাকেন। তিনি ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৯ বছর মোগল সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন। কিন্তু তার সময় থেকেই মোগল সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনে শুরু হয়। এই সম্রাটের সময়ে বিচক্ষণতা এবং দূরদর্শিতার অভাব মোগল সাম্রাজ্যকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
সেরা বই রিভিউ পড়ুন আমাদের সাইটে !
১৭৪৮ সালে সম্রাট মুহাম্মদ শাহর মৃত্যুর পর ১৭৬০ সাল পর্যন্ত ১২ বছর সময়ে আরও তিনজন সম্রাট সিংহাসন আরোহণ করেন। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহ আলম সিংহাসন আরোহণ করলে। আবার অনেকটা সময়ের জন্য এই সম্রাটের সিংহাসন স্থায়ী হয়। তিনি সম্রাট ছিলেন ২৮ বছর। কিন্তু এই ২৮ বছরে এদিকে ঘটে গেছে অনেক কিছুই। কখনো মারাঠা আক্রমণ, কখনো আফগান আক্রমণ, এদিকে ইংরেজ, ফরাসি বেণিয়ারা পাল্লা দিয়ে শুরু করে মোগল ভারতবর্ষ কেড়ে অধিকার করে নেয়া। মোগল সাম্রাজ্য সংকুচিত হয়ে আসতে শুরু করে ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠে দিল্লী কেন্দ্রীক মোগল শাসন। আর এদিকে বাংলা হয়ে উঠে ভারতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র।
১৭৫৭ সালে পলাশীর পরাজয়ের একশত বছর পর ১৮৫৭ সালে প্রথমবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ অর্থাৎ সিপাহী বিদ্রোহ হয়। এই সিপাহী বিদ্রোহ ই এতো দিন টিকে থাকা নামে মাত্র মোগল সিংহাসনের বিলুপ্তি ডেকে আনে। লেখক সিপাহী বিদ্রোহসহ তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রাসঙ্গিক আরো বিদ্রোহ, অন্যান্য অঞ্চলের অবস্থা বিস্তর আলোচনা করেছেন। সম্রাট বাবুর ছাড়া মোগল সাম্রাজ্যের সকল সম্রাটই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন ভারতবর্ষে। কিন্তু হতভাগা শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের জন্মভূমিতে মৃত্যুবরণ করার সুযোগ হয়নি। থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল সুদূর রেঙ্গুনে। নির্বাসিত দুর্বিষহ জীবনের সঙ্গী হয়েছিলেন তার স্ত্রী জিনাত মহল।
তৈমুর বংশধর বাবুর যে সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা তার বংশধরেরা চালিয়ে গেছেন গৌরবের সাথে। সাম্রাজ্যের বিস্তৃতিও করেছেন, ভারতবর্ষের উন্নতি করেছেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন আবার ধ্বংসের দিকে। এই মোগল সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কথা আসলেই প্রথমে আমাদের যা বলা হয় তা হলো নারী এবং মদের আসক্তি। কিন্তু শুধুমাত্র কি নারী, মদের আসক্তিই এই সাম্রাজ্যের পতনের কারণ ছিল? নাকি সাথে ছিল অন্য কিছুও? এসবের উত্তরও লেখক দিয়েছেন গুছিয়ে। মোগল ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বারবার মোগলদের সাথে সম্পৃক্ত পারস্য সম্রাট, মারাঠা দুস্য বাহিনী ও তাদের কয়েকজন প্রতাপশালী সৈনিক, উল্লেখযোগ্য বীর মোগল আমত্যগণ, শিখ বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহসহ আরো পারিপার্শ্বিক অনেক বিষয় এসেছে। যা ইতিহাসের পূর্ণতা দিয়েছে।
সেরা বই রিভিউ পড়ুন আমাদের সাইটে !
মোগলনামা প্রথম খন্ড পড়ে যেটা মনে হয়েছিল যে, মাহমুদুর রহমানের লেখায় ইতিহাস পড়া মানে যেন দাদুর কাছে বসে পুরনো দিনের গল্প শোনা। দ্বিতীয় খন্ড তার এই গুণটা অক্ষুন্ন রয়েছে। নন-ফিকশন ইতিহাসের কোন বই এত সুখপাঠ্য হতে পারে মোগলনামা দুই খন্ড এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কখনো কোথাও মনে হয়নি যে এই লাইনটি এখানে অপ্রয়োজনীয় বা এখানে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন ছিল। পড়তে পড়তে যখনি মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তখনই দেখি লেখক পরে লাইনে সব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে হাজির।
বাংলা ভাষায় মোগলদের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নিয়ে মোগলনামা একটি অসাধারণ কাজ। লেখকের এটার জন্য প্রকৃতই অনেক প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার।
বইটা নিয়ে কিছু অভিযোগ আছে। মোগলনামা প্রথম খন্ড প্রকাশনী বেশ যত্ন নিয়ে ছাপালেও দ্বিতীয় খন্ডে বেশ অযত্নের ছাপ পাওয়া গেছে। কয়েক জায়গায় বানান ভুল, শব্দের মাঝের বর্ণ মিসিং, সালে ভুল পেয়েছি কয়েক জায়গায়। আর কাগজের কোয়ালিটি সম্পর্কে বলবো, এতে বইয়ের যদি দাম বেড়েও যায় তবুও ভালো মানের কাগজ দিয়ে ছাপানো উচিত। কারণ এসব বই সংগ্রহে রাখার মতো বই। বারবার পড়ার মতো বই।
সম্পূর্ণ মোগল ইতিহাস সম্পর্কে আপনার যদি অগ্রহ থাকে তবে আপনি মাহমুদুর রহমানের মোগলনামা দুই খন্ড নিয়ে বসে পড়ুন। আপনার আকাঙ্ক্ষা আশা করি এই বই দুটো পূর্ণ করতে পারবে। আপনাকে মোগল সাম্রজ্যে স্বাগত। আমি বিদায় নিচ্ছি আপাতত এই সাম্রাজ্য থেকে।
সেরা বই রিভিউ পড়ুন আমাদের সাইটে !
প্রকাশনীঃ আহমদ পাবলিশিং হাউস
মুদ্রিত মূল্যঃ ৪৫০ টাকা মাত্র
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ২৪৮

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button