অন্যান্যগল্প

ভালোবাসার হাসির গল্প কেনো হাসায় ? কেনো কাদায়?

ভালোবাসার হাসির গল্প একটা আস্ত দুপুর, মেঝেতে উপুর হয়ে কাটিয়ে দিলাম। শ্রাবণের স্মৃতি রেখে পাঁচ দিনের বাদলা বিদায় নিয়ে গা ভেজানো চিমসে গরমকে সাথী করে ভাদ্র এসেছে সে দুপুরে, ঘর বাঁধবার স্বপ্নে মুখে খড় নিয়ে ছোটাছুটি করছে এক জোড়া উৎকণ্ঠিত শালিক, দলবেঁধে হেতাহোতা ছুটছে পিঁপড়ের ঝাঁক এমন একটা দুপুর আমি হাপুস কেঁদে ভাসিয়ে দিলাম যে বই পড়ে তার পাঠ প্রতিক্রিয়া আমি লিখবো! মোটেও না, মোটেই না।

একটা ছকে বাঁধা সংসার, মেপে মেপে সুখ-দুঃখ, রোজকার অফিস, রাঁধাবাড়া কোনদিন ট্রামের ভাড়া বাঁচিয়ে এক থোকা গোড়ের মালা! সে সংসারে কেন কাল-বৈশাখী এসে আছড়ে পড়ে? ‘শুধু কেরাণী’- বলে বিধাতা এত দহন ঢেলে দেবেন?
সে বইয়ের কথা আমায় লিখতেই হবে?

‘পুন্নাম’- গল্পে চার বছরের খোকা নিয়ে বাবা-মায়ের ভালোবাসার হাসির গল্প সেই যে যমে-মানুষে টানাটানি, ভালোবাসার হাসির গল্প অর্থাভাব,বেদনা-বিদ্রোহ সেসব কী লিখতে ইচ্ছে করে? ছেলেকে বাঁচানোর জন্য বাবা-মায়ের উৎকণ্ঠা আর ত্যাগের সাথে জীবনের অন্ধ নিষ্ঠুরতার কথা, বিপুল ব্যর্থতার কথা কী লেখা যায়? ছেলেকে বাঁচিয়ে তুলতে পিতার চৌর্যবৃত্তির কথা লিখতে গিয়ে তাকে আমি কেন বিবেকের কাঁঠগড়ায় দাঁড় করাবো?

বাঁচিলে যখন অশেষ দূর্গতি তখন তাহার মরাই ভালো- আট বছরের বাতাসী সম্বন্ধে এমন ভবিষ্যবাণী করেছিলেন বিধবা দাক্ষায়ণী। পরিচয়টা তাদের জলের ওপর, পরিচয়ের বিশ্বস্ততা নৌকাডুবিতে। পিতৃ ও শ্বশুরকূলের সম্ভ্রমের পরিচয় ভুলে কখন যেন পতিতা কন্যা বাতাসী হয়ে ওঠে দাক্ষায়নীর বুকের ধন তা বোধহয় লেখকও টের পান না?
সমস্ত সংস্কারের চেয়ে পুরাতন, সমস্ত ধর্ম অপেক্ষা প্রবল মাতৃত্বে দাক্ষায়নীকে প্লাবিত করে বাতাসী একদিন হারিয়ে যায়। যেখান থেকে ফিরে আসা যায় না। এই নিখোঁজ সংবাদ আমি কী করে লিখবো?
‘সাগর সংগম’- এর এমন গল্প পড়ে পাঠক হিসেবে আমার ভালোবাসার হাসির গল্প ভেতরকার আলোড়ন অন্তর্যামী ছাড়া কারও পক্ষে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

 

koster status : কষ্টের গল্প ভরা একটি বই পড়ে নিন !

‘মৃত্তিকা’- শুধু ধারণই করে না ধূলিসাৎও করে। ধূলিসাৎ করে প্রেমিকের প্রতীক্ষার, খুনে স্বামীর পাপের ভাঁড়া। অপেক্ষাকৃত বড় একটা গল্প, মস্তিষ্কজুড়ে তীক্ষ্ম অনুভূতি ছড়িয়ে রেখেছে। সেটা লেখা যায় না, প্রকাশ করা যায় না। ভালোবাসার হাসির গল্প কেবল প্রবল কান্নার মত একটা রোগ এসে আক্রান্ত করে। জীবনের বৈচিত্রহীন ইতিহাস, পুরাতন কথার একঘেয়ে পুনরাবৃত্তিতে জীবন পদ্মপাতার জলের মতো টলমল করে ওঠে।

‘মহানগর’ -এর বুকে সন্ধ্যা নামে বিস্মৃতির মতো গাঢ়- কারও কারও জীবনেও তাই। সব পুরনো কথা, পুরনো স্মৃতি, পুরনো সম্পর্ক ভুলে যেতে হয়। বড়োরা ভুলে যেতেও পারে, যায়। ছোটদের মনে কেবল রাত্রির থেকে ঘন কালো একটা দাগ থেকে যায়। সে দাগের রেশ করে তারা স্মৃতির রশি ধরে ফিরে যায় পুরনোর কাছে। বর্তমান আর অতীত দাঁড়ায় মুখোমুখি। বড় নরোম তাদের পায়ের তলার মাটি, বড় ঠুনকো সে সময়, খুব দ্রুত আবার আঁধার ঘনিয়ে আসে। যেমন এসেছিলো ছোট্ট রতনের জীবনে। সে যেমন মহানগরের বুক থেকে ফেরাতে পারে নি তার দিদিকে। জীবন বড় নিষ্ঠুর, বড় গোলমেলে তার হিসেব।

জীবনের প্রতীক্ষা অবিরাম। ভালোবাসার হাসির গল্প স্বপ্নেরও নেই কোন গাছ পাথার, জীবনের প্রয়োজনে মানুষ বেঁচে থাকে, সংসারের স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন পূরণের লোভে প্রতীক্ষা করে অনিশ্চত আগামীর। এমনই এক স্বপ্নালু নারী রজনী, এক ঝড়ের রাতে তার ঘরে অতিথি হয়ে আসে অঘোর দাস। বিস্তর লেনাদেনার পর তারা যখন পরস্পরকে ছেড়ে না যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়, সংসারের স্বপ্নে দেশান্তরি হবার সিদ্ধান্ত নেয় তখনই সমাজ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কী অপরাধ তাদের? জন্মাবধি যে চুরিবিদ্যা করে এসেছে তার কী সংসারের সাধ থাকতে নেই। পতিতাবৃত্তি করতে গিয়ে যে সর্বস্ব হারিয়েছে তার কী সংসারের স্বপ্ন দেখতে নেই? কেন প্রতীক্ষার গরাদে আটকে গেলো তাদের স্বপ্ন, সাধ, সংসার এ প্রশ্নের জবাব না মিললে এই বইটার কোন রকম পাঠ প্রতিক্রিয়া আমি লিখবো না।
ব্যস…

বই: নির্বাচিত গল্প
লেখক: প্রেমেন্দ্র মিত্র
প্রকাশক : সুচয়নী পাবলিশার্স
মুদ্রিত মূল্য: ১৬০ টাকা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button