অন্যান্য

বাংলাদেশের খবর পেয়ে যাবেন এই বইতে কিভাবে জেনে নিন !

বাংলাদেশের খবর আরে ছেলে তোমার নামটা তো বুঝলুম, তা তোমার টাইটেলটা কি? চক্কোতি না চক্রবর্তী?” খবরের কাগজের ডিলার বেশ বিরক্তির সাথেই প্রশ্নটা করল শিবরাম কে।

 

শিবরাম মাথা চুলকে, এদিক ওদিক তাকিয়ে,ছেঁড়া জুতোটা ডান পা থেকে খুলে পায়ের তেলোটা বাম হাত দিয়ে চুলকে আবার সেই হাত দিয়ে কপালের একপাশ চুলকে ভাবতে লাগলো আসলে তার টাইটেলটা কি? চক্কোতি না চক্রবর্তী?

 

বাংলাদেশের খবর এই অবস্থা দেখে কাগজ ডিলার কি যে তার টাইটেল ফর্মে বসালেন জানা নেই। তবে তিনি নাকটা সিঁটকে বললেন “ওহে ভজা,এ কাকে তুলে এনিছিস? ছে ছে, পায়ের তেলো চুলকে আবার সেই হাত দিয়ে কপাল চুলকায়। জানিনা বাবা আর কোথায় কোথায় চুলকায় ব্যাটা। “

 

শিবরাম বেশ খানিকটা হেসে নিয়ে বলল “উফফ, কি যে বলেন মশাই। শরীরের অঙ্গ যেমন হাত, তেমনি পা, আবার তেমনি কপাল। এবার পায়ের তেলো চুলকালে পা দিয়ে তো আর চুলকানো যায়না অথবা কপাল চুলকালে ঠোঁট দিয়েতো আর চুলকানো যায়না। যেখানেই চুলকানি হোক, সেই হাত দিয়েই চুলকাতে হবে। এবার সব যদি একসাথে চুলকায় কি করব বলুন?”

 

ডিলার মশাই বললেন “ তা ও ছেলে চুলকানি সঙ্গে করে নিয়ে কোথা থেকে এসেছ বাবা?”

 

শিবরাম আবার খানিকটা ভাবতে শুরু করলেন। এবং সবে জুতোটা খুলে হাতটা পায়ের চেটোতে দিতে যাবে ডিলার মশাই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন “ আচ্ছা বাবা, আমার ঘাট হয়েছে তোমাকে কিচ্ছুটি বলতে হবেনা আর।তুমি এখন এসো।“ আর একটু চেঁচিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে বললেন “ ওহে ভজা একে নিয়ে যা। আর কাগজ দিয়ে দে। বেচুক ব্যাটা। আর এখানে আনলেও আমার সামনে আনিস না। ছে ছে কি গেদরা ছেলেরে বাবা।“

 

ভজা কাগজের একটা গোছা শিবরামের হাতে ধরিয়ে বলল “চলো এবার। বেশ লোক তুমি পথ থেকে তুলে এনে একটা কাজ দিলুম সেটাও খেতে বসেছিলে। আচ্ছা ওই মন্দিরে ভিক্ষা করে খেতে ভালো লাগছিল?”

 

বাংলাদেশের খবর শিবরাম তখনকার জন্য কিছু বলল না ভজাকে। বাড়ি থেকে পালিয়ে এই কৈশোর বয়সে কলকাতা এসে উঠেছে সে। বিনা টিকিটে ট্রেনে করে না খেয়ে না দেয়ে এসে এখানকার এক মন্দিরের বাইরে ভিখারিদের সাথে বসে ভিক্ষা করে যেটুকু জুটেছিল তাতেই রাবড়ি আর রসগোল্লা খেয়ে কাটিয়েছে দু-দিন। তিনদিনের মাথায় ভজার সাথে দেখা। তারই বয়সী একটা ছেলে।শিবরামকে দেখে প্রথমে তার দিকে মিনিট দুই তাকিয়ে ছিল ভজা। তারপর তার সামনে এসে প্রশ্ন করল “ ও ভাই। তোমাকে দেখে তো এদের বংশধর বলে মনে হচ্ছে না। কে তুমি? এখানে কেন?”

 

শিবরাম একটু হেসে বলল “ বাংলাদেশের খবর আমার আর এদের মধ্যে কোথায় তফাৎ একটু বল দিকি।“

 

ভজা ভ্রুটা কুঁচকে বলল “অনেক তফাৎ, সে যদি বুঝতে আজ ওদের মধ্যে থাকতে তুমি? তা ভায়া দেখে তো ভদ্র ঘরের ছেলে বলেই মনে হচ্ছে। এইভাবে ভিক্ষা করে ক’দিন চলবে?”

 

শিবরাম এবার বেশ জোড়ে জোড়ে অট্টহাসি হেসে বলল “ আচ্ছা ভাই, ভদ্রলোক কি আমার কপালে লেখা আছে? কই আমিতো কোনদিন দেখতে পেলুম না। এইতো বেশ ফাস্ট-ক্লাস আছি। কোথায় দুঃখ আর কাল দু-বেলা বাবড়ি খেয়েছি, রসগোল্লা খেয়েছি। একটা সিনেমাও দেখেছি। আর কি চাই বলো?”

 

ভজা আর কিছু বলতে পারলনা শিবরামকে। এক-দু বার তার দিকে তাকিয়ে হাতটা ধরে বলল “ চলো,একটা কাজ করো। খেটে খাও ভগবান হাত দিয়েছে পা দিয়েছে।“

 

শিবরাম ভজার দিকে অবসন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল “ আবার কাজ? ও ভাই রেহাই দাও। এই কাজ-টাজ করতে একেবারে ভালো লাগেনা আমার।বেশ আছি দেখো একেবারে ফাস্ট-ক্লাস।“

ভজা আর কিছু না বলে হাতটা ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে এই কাগজের ডিলারের কাছে নিয়ে এসেছে। সেও খবরের কাগজ ফেরি করে বেড়ায় আর তার সাধ্য অনুযায়ী শিবরামকে সে এই কাজটাই দিতে পারত। আর তাই দিলও সে।

শিবরাম অবশ্য কাজের কথা যে একদম ভাবেনি তা নয়। সে ভজাকে বলল “ খবরের কাগজ মানেতো বেশ ভারী জিনিস। আচ্ছা ধূপকাঠি বেচলে কেমন হয়?”

 

ভজা মাথা চুলকে চোখ দুটোকে গোল্লা পাকিয়ে বলল “ কি কুঁড়েরে বাবা তুমি। এত কুঁড়ে লোকের পৃথিবীতে কোন জায়গা নেই। যে কাজ’টা দিলাম করতে হয় করো আর নয়ত আবার মন্দিরের বাইরে বাটি হাতে বসে যাও। “

 

শিবরাম আর কিছু না বলে খবরের কাগজ ফেরী করতে চলে গেল।

“তুমি ভায়া শ্যামবাজারের দিকটা যাও। আমি অন্যদিকে গেলুম।বাংলাদেশের খবর  “ বলে ভজা বেড়িয়ে গেল।

শিবরাম শ্যামবাজারের দিকে গিয়ে “কাগজ চাই কাগজ “ বলে চেঁচাতেই কোথা থেকে চার-পাচটা লোক এসে জুটে গেল তার সামনে। তাদের হাতেও কাগজের গোছা। শিবরাম তাদেরকে দেখে বলল “ ওহে ভায়া। তোমরাও কাগজ বেচতে বেড়িয়েছ !আহা খুব জমবে চলো একসাথে সবাই মিলে চেঁচাই। কাগজ লাগবে কাগজ।“

 

কিন্তু তাদের মনে আলাদা চিন্তা-ভাবনার বীজ রোপণ করা ছিল। ওই এলাকা বাঁচানোর লড়াই। সবাই মিলে কটকট চোখে শিবরামের দিকে তাকিয়ে থাকল খানিকক্ষন।তারপর তাদের মধ্যে একজন বলল “কান খুলে শুনে রাখো ভায়া, এ এলাকা আমাদের আগে থেকে দখল করা। তুমি নতুন লোক।এখানে এখন তোমার ঢোকা চলেনা। ভালোয় ভালোয় বেড়িয়ে পড়ো।তা না হলে খারাপ হবে।“

 

শিবরাম বলল “ পুরো পৃথিবীটা তো একটাই এলাকা ভায়া।বাংলাদেশের খবর আরে ছেলে তোমার নামটা তো বুঝলুম, তা তোমার টাইটেলটা কি? চক্কোতি না চক্রবর্তী?” খবরের কাগজের ডিলার বেশ বিরক্তির সাথেই প্রশ্নটা করল শিবরাম কে।আমার তোমার বলে আবার ভাগ কিসের? “

 

তাদের মধ্যে একজন চোখ দুটো বড় বড় করে বেশ রাগী মুখে তাকিয়ে বলল “ অতশত জানিনা ভায়া, কাল থেকে তোমায় যেন এই এলাকায় না দেখতে পাই।“

 

শিবরাম বেগতিক দেখে বলল “ফাস্ট ক্লাস বলেছ ভায়া। কাল থেকে অন্য এলাকায় গিয়ে ঘাঁটি গড়ব তাহলে। আজকের দিনটা এখানেই থাকি।“

লোকগুলো চলে যেতে সেদিনের মত রেহাই পেল শিবরাম। সারাদিন কাগজ বেচে যেটুকু কমিশন এলো। বিকেলে মিষ্টির দোকানে গিয়ে রাবড়ি , রসগোল্লা খেয়ে একটা সিনেমা দেখে কোন একটা ফুটপাথে শুয়ে তার সেই দিনটা কাটলো।

হ্যাঁ এটাই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। রাবড়ি-রসগোল্লা-কাটলেট আর সিনেমা এইক’টা জিনিস থাকলে তার আর কিছুই তার লাগেনা। তার বিশ্বাস এই ক’টা জিনিস দিয়েই তার জীবনধারণ সম্ভব।

 

শিবরাম চক্রবর্তী কে নিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম মাস দুই আগে। তারপর নানা চাপে আর লেখা হয়ে ওঠেনি। একটা রাজপরিবারের ছেলের কাহিনী লিখতে বসলে, বা সেই পরিচয়টা নাহয় বাদই দিলাম। একজন রম্য লেখকের কাহিনী লিখতে বসে কতবার যে নিজেকে অসহায় পেয়েছি জানিনা।

 

মানুষ ওনাকে একজন রম্য লেখক হিসেবে চেনেন। বেশিরভাগ‌ই তার কলমে হাসির ফোয়ারা উঠেছে, মানুষকে ভীষনভাবে হাসতে বাধ্য করেছেন তিনি। ‌কিন্তু তার জীবন ওতটা হাসিময় ছিল কিনা সেটা কতজন জানেন? শুনেছি যে মানুষ বাইরে যত বেশি হাসে তার গভীরে তত বেশি দুঃখ বেদনা জমা হয়ে থাকে। আগ্নেয়গিরির লাভার মত জমা হতে থাকে সেগুলো।

 

আজ ওনার মৃত্যু দিবসে আমার এই লেখাটা ওনার প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি আর ভালোবাসা। আমার মনের অনেক কাছের একজন মানুষ তিনি।ওঁর লেখার মাধ্যমে যেন কোথাও ওঁর লুকায়িত বেদনা গুলো দেখতে পাই আমি।

 

চাঁচলের রাজবাড়ির উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি।বাংলাদেশের খবর ১৯০৩ সালের ১৩ই ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। এত বড় বংশ পরিচয়কে কোনদিন কোন কাজে লাগেনি। ওঁর পুরো জীবনটাই কেটেছিল মুক্তারাম স্টিটের মেসবাড়ির দোতলার ঘরে। শেষ জীবনটা গভীর অর্থসংকটের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পশ্চিম বঙ্গ সরকার তার মাসিক খরচের ব্যবস্থা করেছিলেন।

 

কলেজে পড়ার সময় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে আন্দোলন আর তার জন্য জেল খাটা। তারপর লেখালেখি চালু করা। প্রথম লেখা ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শোনা যায় তার প্রথম লেখা তিনি আমাদের অনিলা দেবী মহাশয় কে দেখাতে নিয়ে গেছিলেন। এবং তিনি গ্রিন সংকেত দিতে সেটি একটি ততক্ষনাত পত্রিকাতে ছাপা হয় কিন্তু সেখানে লেখকের নাম ছিল শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এটা দেখে মুচরে পড়েছিলেন তিনি কিন্তু ভেঙে জাননি।বাংলাদেশের খবর আবার উঠে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এমনকি শিশির ভাদুড়ী তার রচনা নিয়ে একটি নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। তার এক টাকাও পাননি তিনি। শরৎচন্দ্র বাবু এসে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই টাকার থলে। বলে গিয়েছিলেন ” ওর বৌ নেই, বাচ্চা নেই, সংসার নেই। অবিবাহিত ছেলে। কি করবে টাকা নিয়ে?”

 

জেল খেটে বেরিয়ে এসে শোনেন তার একমাত্র ভালোবাসার মানুষ রিনির বিয়ে হবে। সেই থেকে কিছুদিন ফুটপাতে কাটিয়েছিলেন, আর জীবন থেকে ভালোবাসা নামক জিনিসটা মুছে গিয়েছিল চিরতরে। বিয়ে করেননি আজীবন। এখন একটু কিছু হলেই আমরা বলি মন ভেঙে গেছে। আর তারপর জোড়া লাগিয়ে আবার নতুনকে জায়গা করে দিই। কিন্তু মন ভাঙা মনে হয় এটাকেই বলে। আর জোড়া লাগেনি। শেষ জীবনটা নিঃসঙ্গ কেটেছিল তার। দেখাশোনার মত কেউ ছিলনা তার পাশে। তবুও সংগ্রাম করে গেছেন আজীবন।

 

আজকের দিনে ১৯৮০ সালে তার সংগ্রাম শেষ হয়।বাংলাদেশের খবর সারাজীবনটা মেস বাড়িতে থেকে নিজেকে সবার থেকে আড়াল রেখেছিলেন তিনি। অনেক অভিমানে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন প্রতিনিয়ত। তবুও লেখা ছাড়েননি। লিখে গেছেন আর সেই কলমের মাধ্যমে আজও আমাদের মধ্যে জীবিত তিনি। মৃত্যুর পাঁচ মিনিট আগেও তিনি বলেছিলেন “আমি ফার্স্ট ক্লাস আছি।”

 

লেখায় প্রতারণা প্রাচীন কালের প্রথা। চলে আসছে, আগামী দিনেও চলবে হয়ত। কিন্তু তবুও জন্মাবে শিবরাম যুগে যুগে, বাংলার বুকে। কবির ভাষায় ” তুমি রবে নীরবে”………

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button