বই রিভিউ

বই উৎসব এর সেরা বই ! দেখে নিন সব কটির রিভিউ !

বই উৎসব এর সেরা বই !সেলিনা হোসেনের রচিত কাঁটাতারে প্রজাপতি উপন্যাসে একটি বিশেষ সময়, বিশেষ ঘটনা, বিশেষ চরিত্রদের ফুটিয়ে তুলা হয়েছে। কাঁটাতারে প্রজাপতি নব প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে নাচোল অঞ্চলে সংগঠিত কৃষক বিদ্রোহ তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত। উপন্যাসটিতে তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক সংগ্রামের চিত্র বাস্তবতা ও কল্পনার মিশেলে তুলে ধরেছেন লেখিকা।
এ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র ইলা মিত্র এবং তার স্বামী জমিদার পুত্র রমেন মিত্র। তারা ছিলেন নাচোল অঞ্চলে কৃষক আন্দোলনের সংগঠক। রাজনৈতিক আবহে নির্মিত এই উপন্যাসে আরো কয়েকটি ঐতিহাসিক চরিত্রকে দেখতে পাওয়া যায়। যেমন:- তেভাগা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী অনিমেষ লাহিড়ী, আজহার হোসেন, ফণিভূষণ মাস্টার সাঁওতাল সরদার মাতলা মাঝি, সাঁওতাল কর্মী হরেক, তফিজুদ্দিন দারোগা, ওসি রহমান, নির্যাতিতা ইলা মিত্রের চিকিৎসক ডাক্তার আইয়ুব আলী। উপন্যাসটিতে মূল কাহিনীকে জাগিয়ে তুলতে অসংখ্য কাল্পনিক চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজমল,আজিজ, জোতদার নাসির আলী, আসিয়া, কুতুব, আংশিক আলি, সুখিয়া, সুচন্দ, দিণমণি।
উপন্যাসটি তেভাগা আন্দোলনকে উপজীব্য করে নির্মীত হলেও বহুবিধ কাহিনী ও ঘটনার সামঞ্জস্যতা গল্পটি এক অন্য মাত্রা পেয়েছে।
একজন নারীর ধরাবাঁধা জীবনের বাইরে গিয়ে পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বঞ্চিত মানুষের জন্য সংগ্রামের নেতৃত্ব সারা বইতে রোমাঞ্চিত করে। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকিত করে ইলা মিত্রের পুলিশি অত্যাচারের জবানবন্দী। একজন নারী হওয়ার দরুন তার অত্যাচারের ধরণও ছিল অন্য কমরেডদের চেয়ে ভিন্ন। কিন্তু তিনি সংস্কার ছিন্ন কোন কিছু গোপন না করে তার অত্যাচারের বিবৃতি প্রকাশ করেন। বই উৎসব এর সেরা বইকিন্তু এই বিবৃতি তৎকালীন কোন পত্রিকাই প্রকাশ করেনি। কমিউনিস্ট পার্টি থেকে লিফলেট আকারে এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছিল।
কাহিনী সম্পর্কে আমি বিশেষ কিছু বলতে চাই না। ইতিহাস আশ্রিত লেখা আমার বরাবরই প্রিয়। আমাদের নিকট অতীতের এক গৌরব গাঁথা নিয়ে লেখা এই উপন্যাস। লেখিকার চমৎকার লেখনী, আর কল্পনা শক্তির মিশেলে এই ঐতিহাসিক চরিত্ররা পূর্ণ প্রাণ পেয়েছে উপন্যাসে। অনেকদিন পর আচ্ছন্ন হয়ে এমন একটা বই পড়লাম।
একা এবং অন্যান্য গল্পগ্রন্থটি আদৃতা মেহেজাবিনের প্রথম প্রকাশিত বই। গল্পগ্রন্থটি মোট
১১টি ছোটগল্পে সাজানো হয়েছে। গল্পগুলোতে প্রেম ভালোবাসা, মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখ দুঃখ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বা ঘৃণা ইত্যাদি বিষয়ের উপর লেখা। উনার টাইমলাইনে উনার লেখা গোটাকয়েক পড়া হয়েছিল। কোন দুয়েকটা গল্প ভালোও লেগেছিল। যদিও সেই গল্পগুলো এই বইতে ছিলো না।বই উৎসব এর সেরা বই তিনি বেশ রোমান্টিক কবিতাও লেখেন। মাঝে মাঝে পড়া হয়েছে।
কিন্তু এই গল্পগ্রন্থ ততোটা আশা পুরন করতে পারেনি। কয়েকটা গল্প বেশ মিষ্টি ছিলো ভালো লেগেছে। প্রথম গল্প ‘গর্ব’ বেশ কয়েক জায়গায় অসংলগ্ন ছিলো।
একটা বিষয়ে বেশ অবাক হয়েছি। লেখিকা কয়েকটা গল্পের শেষে কবিতা যুক্ত করে দিয়েছেন। জীবনানন্দের কবিতাংশ আছে কয়েকটা। কিন্তু লেখকের নাম উল্লেখ বা ভূমিকায়, নোটসে কোথাও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেননি। ক্রেডিট ছাড়া অন্যজনের কবিতা গল্প উপন্যাসে কতোটা যুক্তিযুক্ত তা পাঠকদের উপর ছেড়ে দিলাম।
তবে এই কবিতা পড়ে অনেক পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। তারা ধরেই নিতে পারেন এটা লেখিকার লেখা কবিতাই। এটা কম্য নয়।
আরেকটা গল্পের নাম ‘বছর বিশেক পর।’ মনে আছে সৃজা ঘোষের জনপ্রিয় ‘বছর চারেক পর’ কবিতার কথা? এখানে শুধু নামের মিলই নয়, লেখিকা বছর চারেক পর কবিতাটাকে একটু পরিবর্তন করে গল্পের শেষে জুড়ে দিয়েছেন কয়েক লাইন। ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টা আমার পছন্দ হয়নি। আপনাদের সুবিধার্থে আমি পরিবর্তিত কবিতাটার ছবি যুক্ত করে দিলাম।
লেখিকা যেখানে নিজে সুন্দর সুন্দর কবিতা লেখেন সেখানে কৃতজ্ঞতা স্বীকার ছাড়া অন্য কবিতা কেনো কপি করলেন আমার বোধগম্য হয়নি। কবির নামটা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। কবিতাগুলো চরিত্রের মুখে বসিয়ে দিলেও খানিকটা পাশ কাটানো যেতো। কিন্তু এখানে খুব যে প্রাসঙ্গিক ছিল তাও না। শুধু গল্পের শেষে পেজ ভরানোর জন্য কবিতা সেঁটে দেওয়া হয়েছে।
২০২০ শে পড়া বইগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ বইটা আজকেই শেষ করলাম। জীবনে সবচেয়ে ধীরগতিতে পড়ে শেষ করা ইয়েস্তান গার্ডারের সোফির জগৎ বইটি। বইটা সম্পর্কে রিভিউ তো দূরে থাক অগোছালো আলোচনাও হয়তো আমি করতে পারবো না। তাই সেদিকে আর যাচ্ছি না। যেটা শেয়ার করতে চাই তা হলো আমার নিজস্ব কিছু অসংলগ্ন অনুভূতি।
তার আগে বইটা সম্পর্কে আপাতত একটু ধারণা নেয়া যাক। নরওয়েজিয়ান লেখক ইয়স্তেন গার্ডারের সোফির জগৎ বইটি মূলত দর্শন নিয়ে লেখা কিশোর উপন্যাস টাইপের বই। সোফি নামক এক কিশোরীকে দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা দেয়াকে কেন্দ্র করেই এই উপন্যাস। আলবার্ট নক্স নামক একজন সোফিকে দর্শন বিষয়ে আগ্রহী করে তুলেন। সোফির বয়সী হিন্ডা নামের একটি মেয়ে এবং তার বাবা মেজর আলবার্ট মোলার ন্যাগ নামে আরো দুটি রহস্যময় চরিত্র রয়েছে বইটিতে।
বইয়ের শুরুটা হয় বেশ নাটকীয় ভাবে। সোফি স্কুল থেকে ফিরে বেনামে একটা চিঠি পায় যেখানে লেখা থাকে শুধুমাত্র একটা কথা “তুমি কে?” তার পরের চিঠিতে লেখা ছিল, “পৃথিবীটা কোথা থেকে এলো?” এই প্রশ্নগুলো সোফিকে ভাবিয়ে তোলে। এবং উত্তর গুলোর খোঁজে সে আগ্রহী হয়ে উঠে। আমাদের সবার মনেই কোন না কোন সময়ে এই সব প্রশ্ন জাগে।
কয়েকদিন লুকোচুরি দর্শন কোর্স চলে। অচিরেই সোফির সাক্ষাত হয় তার দর্শন শিক্ষক আলবার্ট নক্সের সাথে। আলবার্ট নক্স সোফিকে সক্রেটিসের পূর্ব যুগের দার্শনিকদের থেকে শুরু করে হাল আমলের দার্শনিক পল সার্ত্রের দর্শন পর্যন্ত আলোচনা পর্যালোচনা করেন। তিন‌ হাজার বছরের জটিল সব দার্শনিক চিন্তাভাবনাকে জড়ো করে সরলাকারে পাঠকের সামনে হাজির করেন। দর্শনের মতো একটা জটিল বিষয়কে লেখক খুব চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। বইটা পড়া শুরু করলেই পাড়ের পৃষ্ঠায় কি আছে সেটা দেখার বা জানার একটা তাগিদ কাজ করে ভেতর থেকে।
একজন মানুষের উৎকৃষ্ট গুণাবলীর মধ্যে একটা হলো যেকোনো বিষয় সম্পর্কে সামঞ্জস্য উদাহরণ দিয়ে বিষয়টাকে উপস্থাপন করা। আর সে ব্যক্তি যদি হন শিক্ষক তবে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়স্তেন গার্ডার উদাহরণে অনন্য। নক্সকে দিয়ে সোফির প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যেভাবে উদাহরণ দিয়েছেন আমি পুরোপুরি বিষ্মিত হয়েছি। এর আগে কোন বইতে বা কোন বিষয়ে এমন পারদর্শী কোন চরিত্র চোখে পড়েনি আমার।
যেকোনো বয়েসের পাঠকের জন্য সোফির জগৎ একটি ধ্রুপদী বই।বই উৎসব এর সেরা বই !  দর্শন সম্পর্কে আগ্রহ থাকলে যে কেউ এই বইটি দিয়ে শুরু করতে পারেন। এই বই আপনাকে ভিন্নভাবে চিন্তাভাবনা করতে শেখাবে, ভিন্ন চিন্তাভাবনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। নিজেকে খোঁজার তাড়না আসবে ভেতর থেকে। সোফি তার প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত পায় কি না? এই মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন হয় কিনা শেষ পর্যন্ত তা জানতে বইটা রুদ্ধশ্বাসে পড়ে যেতে ইচ্ছে করবে পাঠকের। কিন্তু বইটা মোটেও রুদ্ধশ্বাসে পড়ে যাওয়ার মতো নয়। পাঠককে যেতে হবে শ্রেষ্ঠ সব দার্শনিকের প্রশ্নের ভেতর দিয়ে। বই রেখে দিয়ে ভাবতে বাধ্য করে পাঠককে।
তবে বইটিকে দর্শনের সম্পূর্ণ ইতিহাস বলা যায় না। পাশ্চাত্য দর্শনের ক্রমবিকাশ দিয়ে বইটি সাজানো হলেও প্রাচ্যের মুসলিম দর্শন, ভারতীয় দর্শনের গৌতম বুদ্ধের সামান্য কিছু কথা ছাড়া বিস্তর কোন আলোচনা পাওয়া যায় না।
ইয়স্তেন গার্ডারের এই সোফির জগৎ বইটি সারা বিশ্বে বিক্রি হয়েছে তিন কোটি কপি। ৭৭টি ভাষায় অনুদিত হয়েছে বইটি। বাংলাদেশেও জি এইচ হাবিবের অনুবাদ কপির বিক্রি কম নয়।
একটা বই কেনো তিন কোটি কপি বিক্রি হচ্ছে সেটা জানার জন্য হলেও বইটি পড়তে পারেন। বারবার পড়ার মতো একটা বই। আমার ইচ্ছা আছে আরো কয়েকবার বইটা পড়ার।
অনুবাদকের কথা না বললেই নয়। সোফির জগৎ দর্শনের কোর্স হিসেবে যেমন অসাধারণ। জি এইচ হাবীবের অনুবাদ হিসেবেও সফির জগৎ অসাধারন। সুন্দর সাবলীল বর্ণনা।বই উৎসব এর সেরা বই !
বইয়ের শুরুতেই গ্যেটের একটি সুন্দর উক্তি রয়েছে। সেটা দিয়েই আপাতত শেষ করছি,
“তিন হাজার বছর যে কাজে লাগাতে পারে না তার জীবন অর্থহীন।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button