অন্যান্যকবিতালেখক পরিচিতি

আনিসুল হক এর বইটা পড়ে জীবনে সফল হলাম!

আনিসুল হক লিখেছেন,’যে যায় সে আর ফিরে আসে না, কিন্তু মায়েরা প্রতীক্ষায় থাকে, তাদের প্রতীক্ষা দেশ স্বাধীন হওয়ার ১৪ বছর পরেও ফুরায় না।’
বইটির সবচেয়ে প্রিয় লাইনটি দিয়েই শুরু করলাম রিভিউ। রিভিউতে যতটুকু স্পয়লার পাবেন, তার প্রায় সমপরিমাণ স্পয়লায় বইয়ের কভার পেইজে দেয়া আছে, তাই ঘাবড়ানোর কোনো কারন নেই। আনিসুল হকের ‘মা’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় একটি উপন্যাস যা একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ আজাদ ও তার মায়ের জীবন নিয়ে রচিত এই উপন্যাস। বই হিসেবে এটি প্রথম বই যা আমাকে অশ্রু ঝরাতে বাধ্য করেছিল। যারা মোটামুটি বই পড়েন, তাদের মধ্যে ‘মা’ উপন্যাসটি পড়েন নি এমন মানুষ বিরল।
একসময় অত্যধিক বিলাসবহুল জীবন পাড় করে আসা আজাদের মা আজাদের বাবার দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিবাদ করে ছেড়ে আসেন সেই সুখী জীবন, বরন করে নেন মানবেতর জীবন। নিজের প্রয়োজন কিংবা চাওয়া-পাওয়াকে তুচ্ছজ্ঞান করে সর্বস্ব দিয়েছেন একমাত্র ছেলে আজাদকে। এইদিকে বখে যাওয়া আজাদ ফিরে আসে জীবনের গতিময়তায়, করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখনই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। আজাদ আর বসে থাকতে পারে নি, নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছে দেশকে, দেশের মানুষকে, যোগদান করেছে যুদ্ধে। যুদ্ধের খন্ডচিত্র উঠে এসেছে ঘটনার প্রেক্ষাপটে। তুলে ধরা হয়েছে পাক বাহিনীর বর্বর কিছু দৃশ্য। ঘটনার এক পর্যায়ে পাক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা নিবাসের হামলায় আটক হয় আজাদ, রুমী, বদি, জুয়েল, আলতাফ মাহমুদ প্রমুখ।
বন্দিশিবিরে আজাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন আজাদের মা। তিনি ছেলেকে সাহস দিয়েছিলেন, কারও নাম প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলেন। বন্দিশিবিরে যে রুটি খেতে দেয়, তার সরিষাভোরও আজাদ পায় না। তাই আজাদ মাকে বলেছিল, দু’দিন ধরে ভাত খাই না, ভাত নিয়ে এসো। আজাদ ভাত খেতে পছন্দ করত, রুটি তেমন খেতে পারত না। কিন্তু মা ভাত রান্না করে নিয়ে গেলেও বন্দিশিবিরে আর পান নি আজাদকে। অনেক প্রচেষ্টার পরও, নানা জায়গায় ঘুরেও আর খুঁজে পান নি তার ছেলেকে। তিনি হয়ত জানতেন বা হয়ত জানতেন না, যে তার আজাদকে তিনি আর পাবেন না। সেই থেকে তিনি প্রতিনিয়ত অপেক্ষায় থাকেন ছেলে আজাদের জন্য। ছেলের ভাত খাওয়ার আবদার তিনি পুরণ করতে পারেন নি, সেই কষ্টে নিজে সামান্যটুকু ভাত মুখে তুলেন নি। যখন বেঁচে থাকা দায় হয়ে দাড়ালো, তখন সামান্য রুটি খেয়ে জীবন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। কারাগারে শক্ত ফ্লোরে ছেলে হয়ত অনেক কষ্টে ঘুমায় আর তিনি আরাম করে বিছানায় ঘুমাবেন, তা কী করে হয়! তাই তিনি ঘুমাতেন ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে। প্রতিদিন ভাত রেঁধে অপেক্ষায় থাকতেন ছেলের জন্য।
এই অপেক্ষা কতদিন ছিল? তিনি কি অপেক্ষার হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন? না, তিনি বিশ্বাস করতেন তার ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু… ছেলে আর আসে না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আরও ১৪ বছর বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। এই ১৪ বছর তিনি মোটেও ভাত মুখ তুলেন নি, বিছানায় ঘুমান নি। তার অপেক্ষা যেন অনন্তকাল। যেদিন মারা গেলেন আজাদের মা, সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা তাকে কবরে শায়িত করার সমহ ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়তে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই অনুভব করে বৃষ্টির একেকটা ফোঁটা। ‘অতীত তাদের তাড়িয়ে ফেরে, স্মৃতি তাদের ঘিরে ধরে অক্টোপাসের মতো।’ অনুভুতিগুলো লেখক এতটাই বাস্তবিক ও মর্মান্তিকভাবে উপস্থাপন করেছেন, যখন ঘটনার কথা আনমনে ভাবি, তখনই অনুভব করি গড়িয়ে পড়া অশ্রু।
উপন্যাসটিতে শহীদ রুমী, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, শহীদ জুয়েল এদের কিছু ঘটনার খন্ডাংশ ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে জীবনের নানা উত্থান-পতন। ‘পৃথিবীটা একটা নাগরদোলা। মানুষ আজ ওপরে তো কাল নীচে! নিয়তির হাতের পুতুল মাত্র।’ কথাটি খুব বাস্তবসম্মত লেগেছে। সর্বোপরি ‘মা’ উপন্যাসটি আনিসুল হকের এক অসাধারণ সৃষ্টি, অনেক অনেক ভালোবাসা Anisul Hoque স্যার।
কামারুজ্জামান শানিল

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button